শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / জাতীয় / ৭ ডিসেম্বর যে ভাবে সাতক্ষীরা শত্রু মুক্ত হয়

৭ ডিসেম্বর যে ভাবে সাতক্ষীরা শত্রু মুক্ত হয়

 প্রতিনিধি :
পাকিস্তানী পতাকায় ছাত্র জনতার অগ্নি সংযোগ এবং অস্ত্রলুট ও ব্যাংক অপারেশন করে সংগৃহীত অর্থ নিয়ে ৭১ এর মার্চে সাতক্ষীরার দামাল সন্তেনরা মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল তারই সফল সমাপ্তি ঘটে ৭ ডিসেম্বর।

১৯৭১ এর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমূখী আক্রমনের মূখে দখলদার পাকবাহিনী সাতক্ষীরা ছাড়তে বাধ্য হয়। ঐ দিন বীরের বেশে এই মাটির সন্তনরা বাংলাদেশের অর্জিত লাল সবুজের পতাকা কাঁধে নিযে স্বগৌরবে সাতক্ষীরায় বাংলার পতাকা উত্তলোন করে চুমু খেয়েছিল মাটিতে। আজ সেই ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা হানাদার মুক্ত দিবস।
বিজয়ের গৌরবে ৭১ এর এই দিনে যুদ্ধাহত মানুষ আনন্দে উচ্ছেলিত হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেদিনের সাহসী সন্তনরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। পাক হানাদার ও তাদের দোসররা মা-বোনের ইজ্জত হরন করেছিল। ধ্বংস করতে চেয়েছিল বাঙ্গালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে।

শত্রুর বুলেটের এত সব আঘাত সহ্য করেও সাতক্ষীরার সন্তানরা অনন্তঃ ৫০টি যুদ্ধের মোকাবেলা করেছিল। আক্রমন পাল্টা আক্রমন শত্রুর ঘাঁটি দখল ,শত্রু বিতাড়ন ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ৭ ডিসেম্বরের বিজয় অজনের সেই দিনটি ছিল আনান্দ মিশ্রনের এক ঐতিহাসিক দিন।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোন সেক্টর গড়ে ওঠেনি তখনও পরবর্তীতে গড়ে ওঠা ৯ম আর ৮ম সেক্টরেরর সাতক্ষীরার ভোমরা ছিল প্রথম ক্যাম্প। এখানেই সূচনা লগ্ন থেকে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল তৎকালীন ই.পি আর দের সহযোগিতায়। আর ওখানেই ২৯ এপ্রিল পাক বাহিনীর সাথে তরুন নবীন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দীর্ঘ ১৭ ঘন্টা উভয় পক্ষের গুলি বিনিময়ে পাক বাহিনী হারিয়েছিল তাদের কয়েক জন সেনাকে। আর দুই দফার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল তিন বীর যোদ্ধা।

সাতক্ষীরার মুক্তিযোদ্ধাদের দেশাত্মবোধ আর বীরোচিত যুদ্ধের ফলশ্রুতি হিসাবে ৭১ এর নভেম্বরে শ্যামনগর কালিগঞ্জ শত্রু মুক্ত হয়। অন্যদিকে ৭ই ডিসেম্বর মুহিদ খান দুলুর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী যোদ্ধাদল ধুলিহর ইউনিয়নের বেজেরডাঙ্গায় তখনও গেরিলা অপারেশনের পরিকল্পনা করছে। এরই মধ্যে খবর এলো পাক বাহিনী সাতক্ষীরা ছাড়তে শুরু করেছে। ক্ষিপ্রবেগে এই দলটি চলে আসে সাতক্ষীরা শহরে। ক্যাম্প করলেন পিএন হাই স্কুলে। এফ এফ (ফিডম ফাইটার) ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাষ্টার ও হুদার নেতৃত্বে আর একটি দল ঢুলে পড়ে সাতক্ষীরা শহরে। তারা থানা, ডাক বাংলো, পিটিআইতে ঘাটি গড়ে।

এদিকে বীর যোদ্ধা আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে আরও একটি দল এবং মুজিব বাহিনীর বীর যোদ্ধা শেখ কামরুজ্জামান টুকু, আবু নাছিম ময়না, মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে অবস্থান নেন সাতক্ষীরা শহরে। এই ত্রিমুখী আক্রমনের পালা আসতে না আসতেই খবর এলো পাকবাহিনী ও দোসররা ভয়ে পিছু হটছে। বিজয় গৌরবে কাঁধে পিঠে অস্ত্রের বোঝা আর ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে যোদ্ধারা সদর্পে পুনঃ দখল করলেন তাদের প্রিয় মাতৃভূমি। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে অনেকে হতে হয় শহীদ। সবচেয়ে মারাত্মক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৭ জুন প্রত্যুষে। দেবহাটা থানার টাউন শ্রীপুরে যে মহাপরিকল্পনা করে পাক বাহিনীর ব্যুহভেদ করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল তা ফাঁস হয়ে যায়। এ সত্ত্বেও মুক্তিকামী দামাল ছেলেরা সেদিন তাদের অস্ত্র দিয়ে শত্রু সেনাদের জবাব পাল্টা জবাব দিয়েছিল।
৯ম সেক্টরের সদর দপ্তর টাকী থেকে তিনটি পৃথক গ্রুপ তৈরী করে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকে পড়ে মাতৃভূমির মাটিতে। টাকীর ঠিক বিপরীতে টাউন শ্রীপুর এলাকায় অবস্থান ও টহলরত পাক সেনাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবার অদম্য ইচ্ছা শক্তি নিয়ে ক্যাপ্টেন শাহাজাহান মাষ্টারের নেতৃত্বে একটি গেরিলা গ্রুপ অবস্থান নেয় ৬ জুন রাতে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পরদিন সুযোগ বুঝেই ওদের উপর আক্রমন চালানো হবে। কিন্তু উপর্যুপরি রাত জাগা যুব সেনারা কেউ তখনও ঘুমিয়ে কেউ বা নাশতা করছে।

এমনই এক পর্যায়ে খান সেনাদের তৎপরতা ধরা পড়ে। এ সময় একে অন্যকে সতর্ক করা চলতে থাকে। মুহুর্তেই আক্রমাত্মক গুলি ছুটে যায় পাক বাহিনীর সদস্যদের দিকে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। মূহু মুহু গুলির রেঞ্জে পড়ে বেশ কয়েকজন পাক সেনা লুটিয়ে পড়ে। অপরদিকে শত্রুদের শুলিতে শহীদ হন কাজল, খোকন, নারায়ন ও এক ইঞ্জিনিয়ার ছাত্র সহ ৭ মুক্তিযোদ্ধা। ওদের রক্তে ভেসে যায় শুষ্ক মাটি। বীরত্বপূর্ণ এ যুদ্ধে ব্রাশ ফায়ারে বেশ কয়েকটি গুলি বিধে যায় এরশাদ খান হাবলুর দেহে।
সেদিনের ঐ যুদ্ধের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে সাতক্ষীরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার

এসিউর রহমান মসু, মুনজিতপুরের বীর মুক্তিযোদ্বা যুদ্ধকালিন নৌকান্ড সাতক্ষীরা সদর -২ আসনের এমপি মীর মোস্তাক আহম্মেদ রবি, সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মো: হাসানুজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা সোভাষ সরকার জানান, ওরা শহীদ হয়েছিল। এ সীমান্তে মোট ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা পাকহায়নাদের গুলিতে নিহত হয়েছিল। গুলি বিদ্ধ হয়েছিল এরশাদ খান হাবলুসহ আরও অন্তত্য ২০ জন আহত হয়েছিল। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু এই সম্মুখ যুদ্ধে পলাশপলের কামরুল ইসলাম খানের ভূমিকা ছিল খুবই বীরোচিত।

পাক বাহিনীর অন্যতম খুঁটি মহকুমা হাকিম খালেদ মাহমুদকে গ্রেফতার, তার অফিসের পাকিস্থানী পতাকা নামিয়ে অগ্নি সংযোগ এবং বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন। ট্রেজারী থেকে অস্ত্র আর ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ সহ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্ন থেকে শেষ দিনটি পর্যন্ত কামরুল ইসলাম খান রেখেছেন অগ্রহী ভূমিকা। এই সেক্টরে যুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহনকারী মুক্তি যোদ্ধাদের মধ্যে রয়েছেন আইয়ূব আলি, স ম অলিউদ্দীন, সালাম, হাবলু, কামরুজ্জামান, এনামুন হক বিশ্বাস, আবু নাছিম ময়না,গনি, রশিদ, আজিবর, খসরু, হাসনে জাহিদ জজ, ইঞ্জিনিয়র শেখ মুজিবুর রহমান, মোস্তাফিজ, স.ম. বাবর আলিসহ অসংখ্যা মুক্তি যোদ্ধা তারা আজ স্ব স্ব অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে।

এদের মধ্যে অনেকে শাহাদাত বরণ করেছেন। দেশ মাতৃকার মুক্তি অর্জনে দক্ষিণ পশ্চিম বাংলার দুর্দান্ত প্রভাবশালী শার্দুল ক্যাপ্টেন শাহাজান মাষ্টারও আজ লোকান্তরিত।
এদিকে সাতক্ষীরার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৯টি গনকবর ও বধ্যভূমি এবং স্মৃতি স্থম্ভ গুলি আজও অরক্ষিত অবহেলার শিকার।

এদিকে সাতক্ষীরা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরল গাঁথা ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল যশোরের কেশবপুর সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভারতে পাড়ি জমানোর জন্য ৪ শতাধিক স্বরণার্থী সন্ধ্যায় আশ্রয় নিয়েছিল এই বিদ্যালয়ে। খান সেনারা খবর পেয়ে ওই রাতেই তাদেরকে ধরে নিয়ে বিদ্যালয়ের পিছনের নির্মম ভাবে ব্রাশ ফাঁয়ার ও ব্যানেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। পরে সেখানে তাদের মাটি চাপা দেওয়া হয়। সেই ইতিহাস গাঁথা বধ্যভূমিটি আজ দখল হয়েগেছে বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকনার দখলে। যেটা অনেকে দিনেস কর্মকারের বাড়ি হিসাবে চিনতো।

ইতিহাস গাঁথা বধ্যভূমিটি অচিরেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকরে সংরক্ষনের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তা না হলে নতুন প্রজম্ম এর ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে বঞ্জিত হবে।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর এমপি নৌ-কমান্ড বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর মোস্তাক আহমেদ রবি জানান, সাতক্ষীরা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনের বধ্যভূমি,বাকাল ব্রীজের বধ্যভূমি, পাটকেলঘাটার পারকুমিরা বধ্যভূমি, আলিপুর,ঝাউডাঙ্গা সহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতিহাস খ্যাত ও গৌরবগাঁথা গনকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষন করা হবে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে গনকবর সংরক্ষন ও পাঁকাকরনের উদ্যোগ গহন করেছে শেখ হাসিনা সরকার।

এদিকে ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা ঐতিহাসিক শত্রুমুক্ত দিবসটি উপলক্ষ্যে সাতক্ষীরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ড এর পক্ষ থেকে সমাবেশ ,শহরে আনন্দ র‌্যালী সহ বিভিন্ন কর্মসুচির আয়োজন করে থাকেন।

error: Content is protected !!