মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / সাতক্ষীরা / তালা / সাতক্ষীরায় ধান-চাল সংগ্রহে তেলেছমতি কারবার

সাতক্ষীরায় ধান-চাল সংগ্রহে তেলেছমতি কারবার

নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার ৭ উপজেলায় চলতি বোরো ধান, চাল ও গম সংগ্রহ অভিযানে চলছে তেলেছমতি কারবার। নামসর্বস্ব ভূইফোঁড় কৃষক ও মিলারদের কারসাজিতে সিন্ডিকেট হোতারা বনে যাচ্ছে কোটিপতি। সরকারের কয়েক বছরের সংগ্রহ করা চাল ঘুরে ফিরে আবারো এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে। শুধুই পরিবর্তন হচ্ছে বস্তায় আর কাগজে-কলমে। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এ মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলার ৭ উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ২শ ৯১ মেট্রিক টন। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সিদ্ধ ১১ হাজার ৯শ ৭০ মেট্রিক টন, আতপ চাল ১ হাজার ৪শ ৯২ মেট্রিক টন, গম সব উপজেলা মিলে ৪শ ৫২ মেট্রিক টন। ধানের দাম বাজারে সাড়ে ৬শ থেকে সাড়ে ৭শ টাকা। সরকার ধানের মূল্য মণ প্রতি নির্ধারণ করেছেন ১ হাজার ৪০ টাকা। অপরদিকে চাল মণ প্রতি ১ হাজার ৪শ ৪০ টাকা। বাজারে চাল বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে।

অতএব চালের বাজার তুঙ্গে, ধানের বাজার নিয়ে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকরা উৎপাদিত ধান সরকারের গুদামে বিক্রি করতে পারছে না, এটা নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়েছে। কিন্তু জেলায় চালের বরাদ্দ বেশি থাকায় সিন্ডিকেট হোতা ও জেলা-উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তারা ধান বাদ রেখে চাল ক্রয়ে মেতে উঠেছে। চাল ক্রয়ের চালবাজি অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জেলার ২শ ৯৭ চালকল মালিকের উৎপাদন ক্ষমতা ও সক্ষমতা দেখে লাইসেন্স দিয়েছেন জেলা সংগ্রহ কমিটি। ঐ কমিটিতে রয়েছেন প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও চালকল মালিকদের একজন প্রতিনিধি। সংগ্রহ অভিযানে দীর্ঘদিন অচল, উৎপাদনহীন চালকল মালিকদের নাম ব্যবহার করে মিলের বরাদ্দ অনুযায়ী সিন্ডিকেট হোতারা প্রত্যেক উপজেলার খাদ্যগুদামে পৌছে দিচ্ছেন মেয়াদ উত্তীর্ণ চাল। প্রকৃতপক্ষে চালকল মালিকদের লাইসেন্সে উল্লেখ রয়েছে মৌসুমী ধান প্রান্তিক কৃষকদের নিকট হতে ক্রয় করে তা ক্রাশপূর্বক নতুন চাল গুদামে সরবরাহ করতে হবে। আর এ কাজে নিয়মিত তদারকি করবেন জেলা-উপজেলা সংগ্রহ কমিটি। সিন্ডিকেট হোতাদের নিকট থেকে সংগ্রহ কমিটি উৎকোচ গ্রহণ করে অচল মিলকে সচল, উৎপাদনহীন মিলকে উৎপাদন দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এমন তথ্যের অনুসন্ধানে গত ১লা জুন হতে ৯ই জুন পর্যন্ত সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা খাদ্যগুদামের আওতাধীন চালকল মালিকের সংখ্যা ৮৬ জন। যাদের বেশিরভাগই নামসর্বস্ব।

মিল মালিকের নামে লাইসেন্স থাকলেও লাইসেন্সের বিপরীতে গুদামে চাল দিচ্ছে সিন্ডিকেট হোতারা। যাদের একটি বড় অংশ পাটকেলঘাটা বাজারের সাইনবোর্ড বিহীন নামসর্বস্ব গম সমিতি নামের অবৈধ কারবারের ১থেকে ৭নং সমিতি পর্যন্ত কার্যক্রম রয়েছে। সমিতির সদস্যরা চালকল মালিকদের লাইসেন্স বুনিয়াদে খাদ্যগুদামের পরিদর্শকের সহায়তায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জি.আর, টি.আর, ভি.জি.এফ, ভি.জি.ডি, কা.বি.খা, কা.বি.টা. চোরাই চাল ধোলাই (ছাটাই) করে তা প্রবেশ করানো হচ্ছে খাদ্যগুদামে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮৬টি মিলের মালিকদের নাম কাগজে কলমে থাকলেও খাদ্যগুদামে চাল সংগ্রহ অভিযানে টাকা উত্তোলন থেকে চাল প্রবেশে সব স্বাক্ষরই করছেন সিন্ডিকেট হোতারা। যা সম্পূর্ণ আইন ও লাইসেন্স পরিপন্থী। অনুসন্ধানের সময় আরো দেখা গেছে, উপজেলার বেশিরভাগ মিলের বয়লারে এখনো আগুনই জ্বালানো হয়নি। কিন্তু তাদের নামের বিপরীতে চাল সংগ্রহ চলছে। এমন মিলের সংখ্যা ভুরি ভুরি। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ হয়েছে রাকিব অটো রাইস মিলে। যার মালিক হলেন ইবাদুল ইসলাম। ২টি অটো রাইস মিলের অনুকূলে বৃহৎ বরাদ্দের চাল সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ১টি মিলের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সে কিভাবে মিল নির্মাণ না করেও লাইসেন্স পেল এমন প্রশ্ন জনমনে। নির্মাণাধীন মিলের অনুকূলে চাল সংগ্রহ রয়েছে যথানিয়মে। একইভাবে পাটকেলঘাটার বলফিল্ড মোড়ে জাকির রাইস মিলের চাতাল আছে কিন্তু এখনো বয়লারে আগুনই জ্বলেনি। চাতালে ধানের পরিবর্তে রয়েছে করাত কলের অবশিষ্ট ভুষি। কাশিয়াডাঙ্গায় জাহাঙ্গীর হোসেনের মিল পড়ে রয়েছে। পাটকেলঘাটার সিরাজুল ইসলামের মিলে ভাঙানো হয় ভেজাল ঝালের গুড়া ও হলুদ গুড়া। সেখানে চাল উৎপাদন তো দূরের কথা, চাতালই নেই। কাগজে কলমে মিল আছে উৎপাদন নেই। এমন মিলের সংখ্যা উপজেলার জাতপুর, তালা, লক্ষণপুর, দাদপুর, কাশিয়াডাঙ্গা, খলিষখালী, জেঠুয়া, তেঁতুলিয়া, শাকদহা, নগরঘাটা সহ সবদিকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে। যাদের কোন উৎপাদন নেই। কিন্তু তাদের বরাদ্দের চাল খাদ্যগুদামে সংগ্রহ চলছে। উৎপাদন না থাকলেও এ চালের যোগান কোথা থেকে আসছে, কিভাবে আসছে ? অনুসন্ধানে দেখা গেছে জেলার বাইরে খুলনার দৌলতপুর, বাগেরহাট, শার্শা, নাভারণ, পাটকেলঘাটা, যশোরসহ অত্র এলাকার সিন্ডিকেটের গডফাদাররা সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া চাল এরা স্বল্প মূল্যে ক্রয় করে মজুদ করে রাখে। আর প্রতিবছর চাল সংগ্রহ শুরু হলেই এদের চালবাজি শুরু হয়। স্বল্পমূল্যে ক্রয় করা চোরাই চাল নতুন করে ধোলাই হয়ে আবারো সিন্ডিকেটের হাত দিয়ে উৎপাদন ছাড়াই সরকারের সংগ্রহ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। আর এই সিন্ডিকেটের হোতারা চালবাজি করে বনে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার মালিক। যার একটি মোটা অংক যাচ্ছে স্থানীয় সমাজপতি, রাজনীতিবিদ, উপজেলা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং খাদ্যগুদাম পরিদর্শকদের পকেটে।

এ বিষয়ে পাটকেলঘাটা খাদ্যগুদামের পরিদর্শক রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, মিলের নামে বরাদ্দের অনুকূলে চাল গুদামে আসলে তা মান নির্ণয় করে প্রবেশ করানোই আমার কাজ। এর বাইরে তিনি কিছুই জানেন না। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু হেনা মোস্তফা কামাল এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, কাগজে কলমে নয় সব চালকলই উৎপাদনে আছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকির হোসেন জানিয়েছেন, সংগ্রহ কমিটির মাধ্যমেই ধান চাল গম সংগ্রহ চলছে।

error: Content is protected !!