বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / খুলনা বিভাগ / নদী দখলের ফলে সাতক্ষীরার ছোট-বড় ২৭ নদ-নদী অধিকাংশ মৃত ॥ হুমকিতে কৃষিক্ষাত

নদী দখলের ফলে সাতক্ষীরার ছোট-বড় ২৭ নদ-নদী অধিকাংশ মৃত ॥ হুমকিতে কৃষিক্ষাত

মনিরুল ইসলাম মনি ॥
দেশের দক্ষিন পশ্চিমের জনপদ সাতক্ষীরার ছোট-বড় ২৭টি নদ-নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেহাল অবস্থা বেতনা ও মরিচচ্চাপ নদী। নদী দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও নদীর জোয়ার ভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাতক্ষীরার অধিকাংশ নদী তার গতি প্রকৃতি হারিয়ে ফেলেছে। কপোতাক্ষ, বেতনা, কাকশিয়ালী, মরিচ্চাপ, যমুনা, সোনাই, বলুয়া, গলঘেষিয়া, গুতিয়াখালি, সাপমারা নদীসহ অধিকাংশ নদী এখন মরা খালে পরিনত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে ফাঁরাক্কা বাঁধ, অপরিকল্পিত ব্রীজ, স্লুইজগেট, বাঁধ নির্মান,চর দখল করে ইটভাটা তৈরী এবং নদী শাষন করে অবৈধ স্থাপনা নির্মানের ফলে সাতক্ষীরার ২৭টি ছোট-বড় নদীর অধিকাংশই মৃত প্রায়। কিন্তু অধিকাংশ দখলদারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসক। বরং অনেকেই স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে বন্ধবস্থ্য নিয়ে বসত বাড়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে। ফলে হারিয়েযেতে বসেছে জেলার প্রধান নদ-নদী।

নদীর বুকে বসত ঘর, বেড়িবাঁধ দিয়ে মৎস্যচাষের কারনে সাতক্ষীরা ছাড়াও ভৌগলিক অবস্থানগতভাবে সংলগ্ন খুলনা ও যশোর এলাকার কয়েকটি নদী এরই মধ্যে মারা গেছে। কয়েকটি নদী অস্তিত্ব হারানোর পাশাপাশি মূমুর্ষ অবস্থায় রয়েছে অনেকগুলি।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথম এক দশক পর্যন্ত নদীগুলি প্রবাহমান থাকলেও আশির দশক থেকে এর মরনদশা শুরু হয়। ফলে পানি নিষ্কাষনের অভাবে বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্বতা। বছরে প্রায় ৪/৫ মাস জলাবদ্বতা স্থায়ী থাকায় এ জনপদে কৃষকদের ফসল ফলানো দুষকর হয়ে পড়ে।

সুন্দরবন ও সাগর বিধৌত সুজলা শ্যামলা সাতক্ষীরা জেলায় ২৭টি নদ-নদীর তীরে গড়ে উঠেছে শহর বন্দর ও জনপদ। স্বেচ্ছাচারিভাবে নদীর তীরে এমনকি চর দখল করে নদীর মধ্যেও গড়ে তোলা হয়েছে বসতবাড়ি, দোকানপাট, ইটভাটা, কৃষিখামার।

পানি প্রবাহ হারিয়ে মূমুর্ষ দশায় নদী গুলোর এ দখলদারিত্ব নদীর অস্তিত্বকে আরেক দফা হারিয়ে দিয়েছে। ফলে জেলার ২/১ নদী বাদে অধিকাংশ নদীতে বন্ধ হয়ে গেছে জোয়ার-ভাটা। ফলে সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ, বেতনা, কাকশিয়ালী, খোলপেটুয়া, কালিন্দি, মরিচ্চাপ, যমুনা, সোনাই, বলুয়া, গলঘেষিয়া, গুতিয়াখালি, সাপমারা নদীসহ জেলার ছোট-বড় ২৭টি নদ নদীর অস্তিত্ব নেই বল্লে­ই চলে।

এসব নদীতে একসময় বড় বড় লঞ্চ, ইষ্টিমার, গহনার নৌকা চলতো। সে সময় নদীগুলোতে প্রবল জোয়ার ও স্রোত থাকলেও এখন তা মরা খালের মত নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে। নদী ব্যবস্থাপনা লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ায় নৌ পরিবহন ব্যবস্থা হারিয়ে গিয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের কোল ঘেষে প্রবাহিত বেতনা নদী দখলের ফলে তার মৃত্যু ঘটেছে।

বেতনা নদীর বিনেরপোতার দুই তীর দিয়ে নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে ২০ থেকে ২৫টি ইটভাটা। চরভরাটিয়া জমি দখল করে স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে কাগজপাতি তৈরি করে ব্যক্তি মালিকানার নামে গড়ে তুলছে স্থাপনা। বিনেরপোতা ব্রীজের দক্ষিণ প্রান্তে নদীর চরে দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া সেকেনদাঁড়ী গ্রামের আহসান উল্লাহ ও তার ভাই কবির হোসেন বিলাশ বহুল পাকা ইমারাত তৈরী করে গড়ে তুলছেন রাফসান ফুড্স লিমিটেড এর নামে মসলা ফ্যাকটরি। সেখানে রিতিমত চার তলা ফাউনডেশন করে নির্মাণ হচ্ছে পাকা বিল্ডিং। কপোতাক্ষ,যমুনা ও মরিচচ্চাপ নদীরও একই অবস্থা। নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা,ইটভাটা,বাড়ী-ঘর, দোকান পাট ও বিভিন্ন বিনোদনের পার্ক।

সাতক্ষীরার নদ-নদী গুলোর মৃত্যুর প্রধান কারন প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় দখল দারিত্ব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত স্লইচগেট। এছাড়াও উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প, অপরিকল্পিত স্লুইসগেট ছাড়াও এ অঞ্চলের নদীর ওপর ৪৮টি সেতু নদীমৃত্যুর অন্যতম কারন। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধ নির্মানের ফলে উজানে পানির চাপ কমে যাওয়াও নদী মৃত্যুর অপর কারন।

নদী সমূহ ও সংযোগ স্থাপনকারী খালে অপরিকল্পিত নির্মান এবং চিংড়ি চাষের নামে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ গতি হ্রাস করাও দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলে নদীমৃত্যুর অন্যতম কারন। স্থানীয় প্রশাসন ও এসিল্যান্ড অফিস এবং পানিউন্নয়ন বোর্ড কখনো দখলদারদের বিরুদ্বে কোন প্রকার আইনি ব্যাবস্থা না নেওয়ার কারনে নদী দখল আরও বেড়ে চলেছে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি বিভাগে ২১৬ টি স্লুইস গেট রয়েছে। সংশিলিষ্ট সূত্র জানিয়েছে এর মধ্যে ২৮ টি সম্পূর্ন অকেজো হয়ে গেছে।

এ ছাড়া ৫০টির তলদেশ পলি জমে উচু হয়ে যাওয়ায় ও অবৈধ দখল দারিত্বের কারনে পানি নিস্কাশন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। নদীসমূহ পানি প্রবাহ হারানোর পেছেনে এসব স্লুইস গেট অন্যতম কারন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা ।
কপোতাক্ষর নিুাংশ শিবসার সেই স্রোত আর এখন নেই। কপোতাক্ষর গোড়া চৌগাছার তাহিরপুর থেকে পাইকগাছার শিববাড়ি পর্যন্ত ১৭৫ কি.মি এলাকা প্রবাহহীন হয়ে পড়ায় এক সময় প্রতি বছরই নদীর তীরে দেখা দিতো ভয়াবহ জলাবদ্বতা। গত কয়েক বছর আগে সরকারের পক্ষ থেকে ২৬১ কোটি ৫৪ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা ব্যায়ে কপোতাক্ষ খনন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে আর আগের মত জোয়ার-ভাটা হয় না। কোন ভাবে নদীটি মরা খালের মত বোঁচে আছে। বেতনা নদী সহ মরিচ্চাপ ও যমুনা খনন করা হলেও দখল দারিত্বের কারনে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। কাকশিয়ালী নদীরও নাব্যতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বেতনা নদী তার নাব্যতা হারিয়ে পুরোপুরি একটি মৃত খালের রূপ নিয়েছে। অনেক আগেই মৃত্যু হয়েছে মরিচ্চাপের ।এসব নদীর প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য বারবার জনগনের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হলেও তা খুব বেশি কাজে আসছে না। নদী মৃত্যুর ফলে দেশের দক্ষিন জনপদের কৃষিক্ষাতও আজ ধ্বংসের দারপ্রান্তে।

একইভাবে সাতক্ষীরা সীমান্তবর্তী ইছামতি ও সোনায় নদীর এখন পলিযুক্ত হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে এই নদীতে বিশাল বিশাল চর জেগেছে। ভারতীয় ভূখন্ডের নদনদীর সাথে সংযুক্ত এ দুটি নদী বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত বিভাজন করে আছে। চর পড়তে পড়তে নদী তার অস্তিত্ব হারানোয় বাংলাদেশের স্থলভূমিও ক্রমেই হ্রাস পেয়েছে। সুন্দরবনের নদী আড়পাঙাসিয়া, মাদার, মালঞ্চ, চূনা, ও,কোলপেটুয়া নদীর মধ্যখানেও জেগে উঠছে বড়বড় চর। এরই নিকটস্থ যমুনা নদী মারা গেছে তিন দশক আগে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিভাগ-১) এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবুল খায়ের জানান, পদ্মা নদীর পানির প্রবাহ এখন আর দক্ষিন-পশ্চিমের জেলা যশোর ও সাতক্ষীরার নদ-নদীতে নানা কারনে আসতে পারে না। যে কারনে বর্ষা মৌসুমে পলি পড়ে নদীর তল দেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধ নির্মানের কারনে দক্ষিনের সাগর থেকে আসা উজানের পানি পলি নিয়ে আর ফিরে যেতে না পারায় এ এলাকার নদীগুলি পলিযুক্ত হয়ে পড়েছে । নদীর তলদেশ উচু হয়ে পড়ায় তা পানি প্রবাহ হারিয়েছে বলেও জানান তিনি। আর যখনি নদীর মৃতু হচ্ছে তখনি দখল হয়ে যাচ্ছে নদীর জমি। ওই দখলদারদের রিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহনের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের। কিন্তু সেখান থেকে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অনেকেই কাগজ তৈরী করে চর ভরাটিয়া নদীর জমিতে গড়ে তুলছে স্থাপনা। এসব কারনে দ্রুত নদী গুলো হারিয়ে ফেলছে তার গতি-প্রকৃতি।

এক প্রশ্নের জবাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবুল খায়ের দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, নদ-নদী বাঁচিয়ে রাখতে ও জলাবদ্বতা নিরষনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রজেক্ট রেডি করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা শহরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত প্রাণসায়েরের খাল খেজুরডাঙ্গা থেকে এল্লারচর পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে খননের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া দেবহাটা উপজেলার হাবড়া নদী,সাপমারাখাল ও কলারোয়ার নৌওখালী খাল খননের ব্যপারে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অচিরেই নদীর তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যাপারে জেলা প্রশাসককে জানানো হবে।

error: Content is protected !!