রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / জাতীয় / ২৩ এপ্রিল সাতক্ষীরার পারকুমিরা গণহত্যা দিবস

২৩ এপ্রিল সাতক্ষীরার পারকুমিরা গণহত্যা দিবস

স্টাফ রিপোর্টার ॥
আজ ২৩ এপ্রিল সাতক্ষীরা তালা উপজেলার পারকুমিরা গণহত্যা দিবস। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানা সদরের ১কিঃমিঃ উত্তরে পারকুমিরা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পার্শ্বেই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সংগঠিত হয় ইতিহাসের নির্মম এ হত্যাযজ্ঞ। মহান মুক্তিযুদ্ধোর সময় এ হত্যাযজ্ঞে স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে আশ্রয় নেয়া ৭৯ জনকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।

এছাড়া প্রায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও দেশীয় রাজাকারেরা উল্লাসে মেতে উঠে। পাটকেলঘাটাবাসীর জন্য ২৩ এপ্রিল একটি শোকাবাহ দিন।

দিবসটি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহন করেছে ২৩ এপ্রিল পারকুমিরা গনহত্যা দিবস উদযাপন কমিটি।

২৩ এপ্রিল সকাল ৯টায় পারকুমিরা স্মৃতি ফলকে পুস্প মাল্য অর্পণ, সকাল ১০ টায় শোক র‌্যালী, গনজামায়েত, আলোচনা সভা এবং গনহত্যার উপরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এদেশের ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক,বুদ্ধিজীবি,কৃষক ও ক্ষেতমজুরসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। সুজলা-সুফলা,শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী বাহিনী স্বাধীনতার পক্ষের সকলকে হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এসময় দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজাকার ও তাদের দোসরদের সাথে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানীরা নির্বিচারে বাঙালীর উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এমনই একটি হত্যাযজ্ঞের নাম পারকুমিরার গণহত্যা ।
১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ প্রতিরোধ যুদ্ধে পাকবাহিনী পিঁছু হটে সাতক্ষীরা শহরে অবস্থান নেয়। ঐদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পাটকেলঘাটা বাজারের বর্তমান পাঁচরাস্তা মোড়ে অবস্থিত মহসিন মিয়ার দোকানে (তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংক বিল্ডিং) মুসলিমলীগের এক ব্যবসায়ী,তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শেখ আনছার আলী, তার সহযোগী হাফেজ বজলুল করিম বিশ্বাস, বিহারী মনোহর কসাই (মনু) তার ভগ্নিপতি মানিক কসাই, শওকত জাহাঙ্গীর, পাকবাহিনীর একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ আরো অজ্ঞাত ৪/৫জন গোপন বৈঠকে বসে পারকুমিরা ও পুটিয়াখালী গ্রামের নিরীহ হিন্দু মুসলমান দেশপ্রেমিকদের হত্যা এবং তাদের বাড়ীঘর লুটতরাজের পরিকল্পনা করে।

২৩ এপ্রিল শুক্রবার সকালে মিত্র বাহিনীর আক্রমনের আশংকায় সাতক্ষীরায় অবস্থান নিরাপদ নয় ভেবে পাকিস্তানী মিলিটারী বাহিনীর গাড়ীবহর খুলনা-সাতক্ষীরার পথ ধরে খুলনা দিকে যাত্রা করে। যাবার পথে পূর্বদিনের সন্ধ্যায় বৈঠককারীরা পাকবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে করে বেলা ১২টার দিকে পাটকেলঘাটা বাজারে ঢুকিয়ে দেয়। পাকবাহিনী মনোহর কসাই ও জনৈক রুটি বিক্রেতা (পাকিস্তানী গোয়েন্দা) কে সাথে নিয়ে কালীবাড়ী রোড হয়ে সরুলিয়া ও কাশীপুর রাস্তার মুখে মিলিত পারকুমিরা ন্যাড়াবটতলা নামক স্থানে গাড়ীবহর রাখে। এরপর পায়ে হেঁটে পারকুমিরা উত্তর পাড়ায় যায়। সেখানে খুলনার ফুলতলা এলাকার দক্ষিনডিহি ও যশোরের নওয়াপাড়া এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু লোকজন ভারতে যাবার জন্য আশ্রয় গ্রহন করেছিল।

পাকবাহিনী আসার খবর পেয়ে আশ্রিতরা পারকুমিরা গ্রাম হতে উত্তর দিকে দৌড়াতে থাকে। আবার কেউ কেউ উত্তরপাড়ার একটি গাব গাছে উঠে আশ্রয় নেয়। এসময় পাকিস্তানীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে একদল গোষ্ঠ কুন্ডুর বাড়ীতে প্রবেশ করে। অপরদল পুটিয়াখালী গ্রামে চলে যায়। গোষ্ঠক্ন্ডুুর বাড়ীতে প্রবেশ করে পাগল কুন্ডুর বাড়ীতে থাকা নোয়াপাড়া ও ফুলতলা এলাকার শিশুসহ ৪জন,গাব গাছ ও পশ্চিম দিকে বাঁশবাগানে লুকিয়ে থাকা একই এলাকার ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

এছাড়া পাকিস্তানীরা ফিরে আসার সময় পাগল কুন্ডুর পুত্র ষষ্টিকে গুলি করে হত্যা করে। হত্যাযজ্ঞের সময় যখন দুপুরে মসজিদ থেকে জুম্মার নামাজের সুমধুর আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে ঠিক সেই সময় ছোট কাশীপুর গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক সকলের প্রিয় শেখ হায়দার আলী পাটকেলঘাটা বাজারের তার ধান পাটের আড়ৎ বন্ধ করে নামাজ পড়ার জন্য বাড়ীতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌছানোমাত্র খান সেনারা ধরে ফেলে। এসময় তাকে হিন্দুদের বাড়ী দেখিয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানালে গায়ে পাট জড়িয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে।

একই সময় পুটিয়াখালী গ্রামের মুসলমান পাড়ায় খানসেনাদের সাথে মনোহর কসাই ও পাকিগোয়েন্দা গিয়ে শেখ আব্দুর রহমান ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ জালাল উদ্দীনসহ অনেককে ধরে কর্ডন করে পারকুমিরা গ্রামের কুন্ডু বাড়ীতে আনা হয়। জুম্মার নামাজের আগে অতি উৎসাহী কিছু মুসলমান নামাজের পোশাক পরে মিলিটারী কিছু বলবেনা এ সাহসে কুন্ডু বাড়ীতে প্রবেশ করা মাত্রই তাদেরকে বেঁধে ফেলে। সেখান থেকে সবাইকে বেঁধে পশ্চিমদিকে তৎকালীন পারকুমিরা দাতব্য চিকিৎসালয়ের সামনে এনে সবাইকে চলে যেতে বলে বর্ষার মত গুলি করে পুটিয়াখালী গ্রামের শেখ আব্দুর রহমান (৪০), তার জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ জালাল উদ্দীন (১৮), শেখ বদর উদ্দীন (৪৫), শেখ শামসুর রহমান (১৮),সালামত মল্লিক(৩৭),আজিজুর রহমান (৩৮), ফজলুর রহমান (২০), শামসুর রহমান (৪০), অজিয়ার রহমান (৩৬),শেখ সাজ্জাত আলী (২২), শেখ আব্দুল জব্বার (৪৪),শেখ বেলায়েত হোসেন (৪২),সাজ্জাদ আলী (১৯), পারকুমিরা গ্রামের গোষ্ঠবিহারী কুন্ডু (৫০), ষষ্টিপদ কুন্ডু (৪৫),বৈদ্যনাথ পাল (৪০), ছোটকাশীপুর গ্রামের শেখ হায়দার আলী (৪৫), তৈলকুপী গ্রামের নিমাইচন্দ্র সাধু (৫০), যুগীপুকুরিয়া গ্রামের আব্দুর রউফ বিশ্বাস (২০), বাইগুনি গ্রামের দীনবন্ধু সরদার (৩৩), কলাগাছি গ্রামের সতীশ মন্ডল ও খলিশখালীর জনৈক ব্যক্তি (৩৫) যশোরের নোয়াপাড়া ও খুলনার ফুলতলা এলাকার নাম না জানা অনেকেই যারা ভারতে যাবার পথে যাত্রাবিরতি করছিল তাদেরসহ মোট ৭৯ জনকে হত্যা করে।

নির্মম ভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানীরা ফিরে যাবার সময় পাটকেলঘাটা বাজারেও কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে। হত্যাযজ্ঞের সময় পারকুমিরা কুন্ডু পাড়ায় বিভিন্ন বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর পার্শ্ববর্তী দালাল প্রকৃতির কিছু লোকজন বাড়ীতে থাকা বিভিন্ন জিনিসত্র লুট করে নিয়ে যায়। কুন্ডু পাড়া ও পারকুমিরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ৭৯ জনকে হত্যার পর কিছু কিছু লাশ আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীরা সনাক্ত করে নিয়ে গেলেও ঘটনাস্থলে অনেকের লাশ দিনের পর দিন পড়ে থেকে পঁচে গলে দূর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। এলাকাবাসী লাশগুলো উদ্ধার করে পার্শ্বেই মাটি চাপা দেন। সেই স্থানে তাদের কোন স্মৃতি চিহ্ন নেই। সেখানে চলছে বারোমাসী ফসলের চাষ।

পরবর্তীতে ১৯৯২ সালের ২৪ মে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহতদের স্মরণে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি নামফলক স্থাপনার উদ্বোধন করেন। এসময় সাথে ছিলেন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল জলিল, সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনীয়ার শেখ মুজিবুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারপর দীর্ঘ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু আজো পারকুমিরা বধ্যভূমিতে উল্লেখযোগ্য তেমন কেউ আসেনি। নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে তেমন কোন পদক্ষেপ আজো নেয়া হয়নি ।

শহীদ শেখ আব্দুর রহমানের পুত্র তালা উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ নূরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও শহীদ পরিবার তথা পারকুমিরা গণহত্যার ব্যাপারে তেমন কেউ খবর নেয়নি। এমনকি জঘন্যতম এ গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঠাঁই পায়নি। তিনি অরো শহীদ পরিবারের মত আক্ষেপ করে বলেন নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাদেরকে এখানে হত্যা করা হয়েছিল আজো তাদের পরিবার চরম অসহায়ত্বের মাঝে দিনাতিপাত করলেও কোন সহযোগিতা পায়নি। সরকার বা প্রতিষ্ঠান শহীদ পরিবারগুলোর কোন খোঁজখবর নেয়নি।

এ ব্যাপারে বধ্যভুমিতে নিহত শহীদ শেখ হায়দার আলীর পুত্র আওয়ামীলীগ কর্মী শেখ টিপু সুলতান কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল আমার পিতা শহীদ হয়েছেন। গায়ে পাট জড়িয়ে আগুন ধরিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করলেও আজো শহীদ পরিবার হিসেবে আমাদের খবর কেউ নেয়নি।
যাদের রক্তের বিনিময়ে দেশ আজ মুক্ত স্বাধীন। তাদের কথা কেউ মনে রাখেনি। প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল এলেই উদাসীন কোন পথিক পারকুমিরা বধ্যভূমির পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় থমকে যান এবং দাঁড়িয়ে স্মরণ করেন শহীদদের। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও পারকুমিরা বধ্যভূমিতে নিহত শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করা হয়নি কোন শহীদ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভ।

error: Content is protected !!