শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / অন্যান্য / ২০২১ সালে দেশে ডিমের ঘাটতি ১৫০ কোটি ছাড়াবে

২০২১ সালে দেশে ডিমের ঘাটতি ১৫০ কোটি ছাড়াবে

দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে ডিম। দেশে পোলট্রি পণ্যটির উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছে, যদিও তা স্থানীয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে প্রতি বছরই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের মধ্যে দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদিত ডিমের বার্ষিক ঘাটতি দাঁড়াবে ১৫০ কোটি পিসে।

এ সময় দেশে ডিমের পাশাপাশি মাংস ও দুধ উৎপাদনেও বড় ধরনের ঘাটতি থাকবে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে দেশে মাংসের বার্ষিক ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় পাঁচ লাখ টনে। অন্যদিকে দুধের ঘাটতি হবে প্রায় ৫৯ লাখ টন।

ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন বাড়লেও বাংলাদেশ যে এখনো পণ্যগুলোয় স্বয়ম্ভর হতে পারেনি, তা স্বীকার করছেন খাতসংশ্লিষ্টরাও। যদিও স্বল্প সময়ের মধ্যেই এ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব বলে দাবি করছেন তারা। এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বণিক বার্তাকে বলেন, ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন যে গত কয়েক বছরে বেড়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। সেগুলোকে চিহ্নিত করে এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন, মানসম্পন্ন ব্রিড তৈরি করা ছাড়াও খামারিদের নানা ধরনের সহায়তাও দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দুধের উৎপাদন বাড়াতে ব্যক্তি পর্যায়ে গাভী উৎপাদনে জোর দেয়ার পাশাপাশি খামারিদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিসহ অন্যান্য সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। মাংস ও ডিম উৎপাদনে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি বিপণন কৌশল ও বাজারের সঙ্গে খামারিদের সংযোগ বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রমও হাতে নেয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনের পরিবর্তে খামারিরা যাতে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন, সেজন্য তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনেও ভূমিকা রাখা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ধরনের প্রকল্প চলমান রয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব বলে আশা করা যায়।

ডিএলএসের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন হয়েছিল ৫৬৫ কোটি ৩২ লাখ পিস, যা পরের বছর দাঁড়ায় ৪৬৯ কোটি ৬১ লাখে। এরপর ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৪ কোটি ২৪ লাখ পিসে। সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মধ্যে দেশে ডিমের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ পিসে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৫২ কোটি পিস। অর্থাৎ গত ১০ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯৮৭ কোটি পিস।

সরকারি সংস্থাটির তথ্যমতে, সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে হলে একজন মানুষকে বছরে ডিম খেতে হয় ১০৪টি। সে হিসেবে দেশে বর্তমানে পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ১ হাজার ৭১২ কোটি ৮৮ লাখ পিস। যদিও এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৫৫২ কোটি পিস ডিম। সে হিসেবে দেশে ডিমের ঘাটতি রয়েছে এখনো প্রায় ১৬০ কোটি ৮৮ লাখ পিস।

তবে আশার কথা হলো, উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে এখন মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা বাড়ছে। ২০০১ সালে ডিমের মাথাপিছু প্রাপ্যতা ছিল ৩৪টি। যদিও গত বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫টিতে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে ডিম খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, যদিও তা এখনো সন্তোষজনক মাত্রায় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাথাপিছু বার্ষিক ডিম গ্রহণের পরিমাণ দুই শতাধিক।

দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্রের প্রতিফলন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে দুধের উৎপাদন হয়েছিল ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন।

সেখান থেকে বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসে এ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯২ লাখ ৮৩ হাজার টনে। সর্বশেষ গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) তা উন্নীত হয় ৯৪ লাখ ৬ হাজার টনে। যদিও এ সময় দেশে দেশে দুধের চাহিদা ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ২৯ হাজার টন। সে হিসেবে পণ্যটির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৬ লাখ ২৩ হাজার টনে। এ ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে মূলত আমদানির মাধ্যমে।

তথ্যমতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি হয়েছিল ৭৩৬ কোটি টাকার। সেখান থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকায় (প্রাথমিক হিসাব)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুগ্ধ খাতের বিকাশ ঘটাতে চাইলে গুঁড়োদুধ আমদানিতে কঠোরতা অবলম্বনের পাশাপাশি এ নিয়ে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।

তবে মাংস উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই বলে ডিএলএস জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশে মাংসের বার্ষিক চাহিদা ৭২ লাখ ১৪ হাজার টন। অন্যদিকে উৎপাদন হচ্ছে ৭২ লাখ ৬০ হাজার টন। ফলে দেশে এখন চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪৬ হাজার টন বেশি মাংস উৎপাদন হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, উন্নত জাত না আসায় দুধ ও মাংস উৎপাদন সক্ষমতায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ভালো জাত না আসায় দুধ উৎপাদনের জন্য খামারিদের বেশি পরিমাণে খাদ্য ও শ্রম দিয়ে কম উৎপাদন করতে হচ্ছে। ফলে তারা খুব একটা লাভবান হতে পারছেন না। গাভী ও মহিষের দুধ উৎপাদনের ক্ষমতার দিক থেকেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। উন্নত বিশ্বে জাত উদ্ভাবনে প্রতিনিয়তই গবেষণার মাধ্যমে নিত্যনতুন সিমেন উন্নয়ন করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। উন্নত জাত উদ্ভাবন ও চালু না করার কারণে অনেক গরুই এখন ইনব্রিড হয়ে গেছে। আর এ কারণেই মাংস বা দুধ উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, উপার্জন ক্ষমতা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে নিরাপদ দুধ ও মাংসের চাহিদা সামনের দিনে আরো বাড়বে। সেক্ষেত্রে এ চাহিদা মেটানোর জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফা হ আনসারী বলেন, এসব প্রাণীর উৎপাদন বাড়াতে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিগুলোকে সঠিকভাবে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে না। অনেক পুরনো সিমেন দিয়ে গরু-ছাগল উৎপাদন করা হচ্ছে। আবার গরুর সিমেন আমদানিতে এক ধরনের বাধা রয়েছে। এক্ষেত্রে উন্নত জাতের গরুর সিমেন দিয়ে দেশেই জাত উন্নয়ন করতে হবে। নয়তো দেশের আবহাওয়া ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই উন্নত জাতের গরুর সিমেন আমদানি করে দেশে জাত উন্নয়ন করতে হবে। তাহলেই প্রাণী উৎপাদনে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে। নিরাপত্তার অজুহাতে গোঁড়ামি করলে উন্নত প্রযুক্তি খামারিদের কাছে দ্রুত পৌঁছবে না। সেটি করতে ব্যর্থ হলে দুধ ও মাংস আমদানি করে খেতে হবে। বেশি দামে দুধ ও মাংস কিনতে হবে। তাই গরু উৎপাদনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে ব্রিড উন্নয়নে জোর দিতে হবে। এছাড়া খামারিদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে হবে।

error: Content is protected !!