মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / মতামত / রাজনীতি দুর্বৃত্তদের হাতে যেন না যায়

রাজনীতি দুর্বৃত্তদের হাতে যেন না যায়

১/১১ বাংলাদেশের রাজনীতি রীতিমতো ওলোট-পালোট করে দিয়েছে। ১/১১-র আগে এবং পরে এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। ১/১১ এর আগের সময়টায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক অসহানীয় অবস্থা তৈরি হয়েছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে যখন দেশে সামরিক সরকার চলে এলো, তখন অধিকাংশ মানুষ তাদের স্বাগতই জানিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ সামরিক শাসনকে স্বাগত জানাচ্ছে, এমন অভূতপূর্ব দৃশ্যও আমাদের দেখতে হয়েছিল। পত্রিকায় লেখা হতো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আমি লিখতাম সুগার কোটেড মার্শাল ল’।

তখনকার রাজনৈতিক অচলাবস্থায় মানুষ এতটাই বিরক্ত হয়েছিল যে, সেনা শাসনেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল তারা। কিন্তু দুর্নীতির বিরোধিতার নামে ঢালাও অভিযান, সব রাজনৈতিক দল এবং নেতাকে এক পাল্লায় মাপা, রাস্তার পাশে বাজার উচ্ছেদ- ইত্যাদি নানা বাড়াবাড়িতে দ্রুতই সে স্বস্তির জায়গা নেয় আতঙ্ক। আবারও প্রমাণিত হয়, গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো কিছু নেই। রাজনীতিই আমাদের শেষ ঠিকানা। এই রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে ১/১১-এর সরকারের সময় রব ওঠে সংস্কারের। তখন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আর বিএনপির সংস্কারপন্থীরা ক্ষমতাসীনদের কাছে খুব প্রিয় ছিল। এখন রাজনীতিতে ‘সংস্কারপন্থী’ গালি হিসেবেই বিবেচিত হয়। সংস্কারপন্থীরা আসলে ছিলেন সুবিধাপন্থী। সামরিক সরকারের চাওয়া মতো না হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা সংস্কারের চাহিদা ও দাবি দীর্ঘদিনের। ১/১১ সরকারের সংস্কার চেষ্টা সফল হয়নি। তবে ১/১১ ঘটনার পর জনগণের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এক অলিখিত সংস্কার হয় দেশের প্রধান দুই দলে। অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ইমেজের দুই নেতা উঠে আসেন দুই দলের মূল নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই দু’জনই শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র, সৎ, সংবেদনশীল। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতিবিদদের মতো এ দু’জনের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষেদগার, গালাগালি, প্রতিপক্ষ দমনে মাস্তান পোষা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির অভিযোগ নেই।

এই দু’জন প্রধান দুই দলের মূল নেতৃত্বে আসার পর শুরুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা শুভ বাতাস বইতে শুরু করেছিল। কিন্তু মাত্র দু’জন ব্যক্তি তো আর বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া নেতিবাচকতা দূর করতে পারবেন না। তাই নিজ দলেই তারা কোণঠাসা হয়ে যান। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। অভিমান করে লন্ডন চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ঠেকান। পরে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সৈয়দ আশরাফ এক সপ্তাহ দফতরবিহীন মন্ত্রী ছিলেন, তাতেই তোলপাড় চারদিকে। আমিও একটি লেখা লিখেছিলাম। তাতে অনেকে খুশি হয়েছেন, অনেকে বেজার হয়েছেন। একজন কট্টর আওয়ামী সমর্থক ফোন করে আমাকে বললেন, সৈয়দ আশরাফ যে দুর্নীতিবাজ এটা তো লিখলেন না। আমি অবাক হয়ে তাকে বললাম, মানে? উনি বললেন, সৈয়দ আশরাফ সরকারের কাছ থেকে টেলিভিশন এবং ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স নিয়েছেন। আমি বললাম, টেলিভিশনের লাইসেন্স সৈয়দ আশরাফ নয়, তার ভাবি নিয়েছেন। বাংলাদেশে এখন ৪২টি টেলিভিশনের লাইসেন্স আছে। তাই জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলের বউ একটি টেলিভিশনের লাইসেন্স নিলে আমি সেটাকে দুর্নীতি মনে করি না। ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স নেওয়ার খবর আমি জানি না, জানলেও লিখতাম না। সরকারের কাছ থেকে বৈধ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করাকে আমি দুর্নীতি মনে করি না। তাকে আমি বললাম, সৈয়দ আশরাফকে দুর্নীতিবাজ বলতে হলে, আমাকে আগে বলতে হবে বর্তমান সরকারের পুরো মন্ত্রিসভাই দুর্নীতিবাজ। তিনি বললেন, মানে? জবাবে আমি বললাম, বর্তমান মন্ত্রিসভায় সৈয়দ আশরাফের চেয়ে ভালো একজন সদস্যের নাম বলেন। তিনি আমতা আমতা করতে থাকেন, কোনও নাম বলতে পারেননি। সৈয়দ আশরাফ অফিসে যান না, নেতাকর্মীদের পাত্তা দেন না, জনবিচ্ছিন্ন জননেতা- এসবই ঠিক আছে। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ দুর্নীতিবাজ এটা লিখতে হলে, বাংলাদেশের রাজনীতির ওপরই আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।

সৈয়দ আশরাফের যখন মন্ত্রী থাকা না থাকা নিয়ে দোদুল্যমানতা, মির্জা ফখরুলের তখন মুক্তির সংগ্রাম চলছে। সরকার শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছে মির্জা ফখরুলের মুক্তি বিলম্বিত করতে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশে স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি সাময়িকভাবে মুক্তি পেয়েছেন। তবে সরকার যেভাবে মির্জা ফখরুলের মুক্তি ঠেকাতে উঠে পড়ে লেগেছিল তা দৃষ্টিকটূ। বর্তমান সরকার মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে কয়টি মামলা দিয়েছে অনেক খুঁজেও তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। কোথাও লেখা ৮৩, কোথাও ৭৩। এর বেশিরভাগই গাড়ি পোড়ানো, নাশকতা, ভাঙচুর, পেট্রোল বোমা হামলা ইত্যাদি মামলা। এটা ঠিক বিএনপি গতবছর ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আর এ বছর সে নির্বাচনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আন্দোলনের নামে যা করেছে তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি এও বলছি না, আন্দোলনের নামে যারা নাশকতা চালিয়েছে তাদের ছেড়ে দিতে হবে। যারা সত্যি সত্যি দায়ী তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায় অবশ্যই মির্জা ফখরুলকেও নিতে হবে। কিন্তু যারা মামলা করছেন, তারাও জানেন, পেট্রোল বোমা মারা, গাড়ি পোড়ানো, ভাঙচুরের সঙ্গে মির্জা ফখরুল জড়িত নন। তিনি নিজে তো মারেনইনি, মারার পরিকল্পনাও করেননি, কাউকে নির্দেশনাও দেননি। নাশকতার নেতৃত্বের দায় যদি কাউতে নিতেই হয়, তবে তিনি বেগম খালেদা জিয়া বা তার ছেলে তারেক রহমান। আসলে বিএনপির আন্দোলন পরিকল্পনা দলের অন্য কোনও নেতাই জানেন না। আমার বিশ্বাস মির্জা ফখরুল জানলে কখনোই আন্দোলনের নামে এমন নাশকতা করতে পারতো না বিএনপি।

আমি জানি, সৈয়দ আশরাফ আর মির্জা ফখরুলকে এক ব্র্যাকেটে রেখেছি বলে অনেকে মাইন্ড করবেন। বলবেন, সৈয়দ নজরুলের ছেলে আর রাজাকার মির্জা রুহুল আমিনের ছেলে এক হলো। আমি এক পাল্লায় মাপছি না। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় আজ তারা দুটি প্রধান দলের মূল নেতৃত্ব। তাই তাদেরকে সেভাবেই বিবেচনা করতে হবে। আর পিতার অপরাধে পুত্রকে দায়ী করার তত্ত্বে আমি বিশ্বাসী নই। মির্জা ফখরুল ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। পেশা শুরু করেছেন শিক্ষক হিসেবে। তার দুই মেয়েও শিক্ষক। তার স্ত্রীও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। এমন একটি শিক্ষিত পরিবারের সন্তান একটি রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে থাকা অবশ্যই দেশের জন্য, দলের জন্য, রাজনীতির জন্য ভালো। সরকার যেভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে, তাতে মির্জা ফখরুল যদি বিরক্ত হয়ে রাজনীতিই ছেড়ে দেন, তাহলে সেটা কি মঙ্গলজনক হবে? সৈয়দ আশরাফ আর মির্জা ফখরুল দায়িত্ব নেওয়ার পর কাদা ছোড়াছুড়ির পুরোনো প্রবণতা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। অন্তত এ দুজনের মুখ থেকে অশোভন কিছু শোনা যায়নি। বিএনপি বিরোধীদের কাছে আমার প্রশ্ন, বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের চেয়ে ভালো আর কে আছে? মির্জা ফখরুল যদি রাজনীতি বিমুখ হন, তাহলে বিএনপি আবার চলে যাবে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের খপ্পড়ে।

শুধু যে সরকার একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করছে, তা নয়, দলেও তিনি কোণঠাসা। ২০১১ সালের মার্চে খোন্দকার দেলোয়ারের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। তারপর থেকে এত জেল জুলুমের পরও ‘ভারমুক্ত’ হতে পারেননি তিনি। হিসেবে দলের তিন নম্বর নেতা। কিন্তু দলে তার অবস্থান গল্পের সেই তিন নম্বর বাচ্চার মতো। এখনও দলের নীতিনির্ধারণে তার ভূমিকা অতি সামান্যই। অনেকে বলতে পারেন, নীতিনির্ধারণে ভূমিকা যদি নাই রাখতে পারেন, তাহলে পদ ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন। আরে ভাই, এটা তো বাংলাদেশ। আমরা তো রাজনীতিবিদ হিসেবে ফেরেশতা আমদানি করতে পারবো না। কত মন্ত্রী-এমপি দুর্নীতি মামলার সাজা নিয়ে, গম কেলেঙ্কারীর দায় নিয়ে মহা সমারোহে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আর তিনি তো সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

আমরা চাই রাজনীতি দুর্বৃত্তদের হাতে না যাক। ভালো মানুষদের হাতেই থাকুক। তবে ঠক বাছতে গিয়ে যেন গাঁ উজাড় করে না ফেলি।

লেখক : প্রভাষ আমিন, অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

সূত্র : uttorbangla.com

error: Content is protected !!