মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭ 
Download Free FREE High-quality Joomla! Designs • Premium Joomla 3 Templates BIGtheme.net
Home / মতামত / যোগ্য শিক্ষকের অভাবই উচ্চশিক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ

যোগ্য শিক্ষকের অভাবই উচ্চশিক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ

সমস্যা যেহেতু আছে, সমস্যার উত্তরণও নিশ্চই থাকবে। আমাদের আরও ভাবতে হবে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি নিয়ে। সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও যথাযথভাবে কীভাবে করা যায় তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। তবে এসব কিছুতে সরকারি সহযোগিতা একান্ত্মভাবেই প্রয়োজন হবে। সরকারি ও বেসরকারি অংশগ্রহণে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের দেশাত্মবোধ জাগ্রত ও দেশ গঠনে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলব, এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।

প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ :
স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্ত্মারে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে উলেস্নখযোগ্যহারে। পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আরও ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হয়ে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০টিতে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট, ১৯৯২ পাস হবার পর দেশে বেসরকারি উদ্যোগে উচ্চশিক্ষা বিস্ত্মারের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমান সরকার নতুন কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ৪০টিরও অধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৭টি (সূত্র: ইউজিসি)।

সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি যে অনুপাতে হয়েছে সে অনুপাতে শিক্ষক সৃষ্টি হয়নি। প্রয়োজন অনুপাতে শিক্ষক তৈরি করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুপাতে শিক্ষক তৈরি না হওয়ার কারণ হিসেবে উলেস্নখ করা যায় প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষক অনুপাতটি বিবেচনায় না নেয়া। অন্যভাবে বলা যায়, শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে সে চিন্ত্মা না করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া ও শিক্ষক প্রস্তুতের জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা।

শিক্ষক প্রস্তুত একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। একজন শিক্ষক অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে তাকে গবেষণা কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। গবেষণা ও বাস্ত্মব শিক্ষাদানকাল একজন শিক্ষককে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সৃষ্টি বা নবনিযুক্ত শিক্ষকের মান বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আছে। সিনিয়র প্রফেসর ও মধ্যম পর্যায়ের শিক্ষকরা সেখানে আছেন। সিনিয়রদের তত্ত্বাবধানে থেকে জুনিয়র শিক্ষকরা প্রশিক্ষিত হচ্ছেন, অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারছেন সরাসরি। এদিক থেকে অসহায় অবস্থানে আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পর্যাপ্ত উপযুক্ত শিক্ষকপ্রাপ্তি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বেসরকারি উদ্যোক্তারা অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষার পরিবেশ দিতে পারেন। কিন্তু শিক্ষক তৈরির দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। আমরা যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত আছি, আমরা শিক্ষক নিয়োগে সব সময় মেধাবী ছাত্রটিকেই গুরম্নত্ব দিয়ে থাকি। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী সময়ের পরিক্রমায় একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন হয়তো। একজন শিক্ষার্থী যত ভালো রেজাল্টই করম্নক। ভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত হয়েই উচ্চশিক্ষা প্রদান করতে সক্ষম হবে, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। নতুন এই শিক্ষককে গড়ে ওঠার সুযোগ বা যথাযথ প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। এই প্রক্রিয়া একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ব্যয়বহুল তো বটেই।

আমরা শিক্ষকের বিকল্প কিছু ভাবতে পারি কিনা, এ ব্যাপারটি নিয়েও কথা বলার সময় এসেছে। বর্তমান সময়কে বলা হচ্ছে ডিজিটালিটির সময়, টেকনোলজির সময়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তির দখলে চলে গেছে। প্রযুক্তি মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে করেছে সহজ, সাবলীল ও গতিশীল। ডিজিটালাইজেশনের সংজ্ঞা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা যে বক্তব্যটি পাই তা হলো-উরমরঃধষরুধঃরড়হ রং :যব রহঃবমৎধঃরড়হ ড়ভ ফরমরঃধষ :বপযহড়ষড়মরবং রহঃড় বাবৎুফধু ষরভব নু :যব ফরমরঃরুধঃরড়হ ড়ভ বাবৎুঃযরহম :যধঃ পধহ নব ফরমরঃরুবফ. আক্ষরিক অর্থে ডিজিটালাইজেশন হলো প্রযুক্তিনির্ভর একটি পৃথিবী। বর্তমান যুগকে প্রযুক্তির যুগ বলা হয়ে থাকে। প্রযুক্তির আশীর্বাদে বিশ্ব এগিয়ে গেছে অনেকদূর। প্রযুক্তিকে গ্রহণে পিছিয়ে নেই উচ্চশিক্ষাক্রেত্রেও। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিশ্বে উচ্চশিক্ষার স্বরূপ বদলেছে। কিন্তু আমরা এখনো উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি।

‘দ্য কমনওয়েলথ অব লার্নিং’ এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও জন ডানিয়েল এক সেমিনারে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণে ও বৈপস্নবিক পরিবর্তনে ‘প্রযুক্তিগত রূপান্ত্মরের অঙ্গীকার’ গ্রহণ করতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। তার মতে, ‘শিক্ষা তথা উচ্চশিক্ষাকে মানসম্মত করতে ও সম্পদে পরিণত করতে হলে এটি হবে ব্যয়সাপেক্ষ। খরচ হ্রাস করতে চাইলে প্রাপ্তি ও মানের ক্ষেত্রে অনিবার্য ঝুঁকিতে পড়তে হবে।’ ড্যানিয়েল আরও বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশি অর্জন করা যায়, উচ্চমান লাভ করা যায় এবং একই সঙ্গে খরচও কমানো যায়। এটিই একটি বিপস্নব। যা পূর্বে কখনো ঘটেনি।’

আমরা যদি ক্লাসরম্নমে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ পদ্ধতি যুক্ত করতে পারি তাহলে যোগ্য শিক্ষকের যে সংকট সেটা দূর করা সম্ভব হবে। ডিজিটাল শিক্ষণপদ্ধতি বলতে আমরা সাধারণত যেটা বুঝে থাকি সেটা হলো ক্লাসরম্নমে প্রজেক্টর যুক্তকরণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সন্নিবেশ ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো তো থাকবেই। আমার প্রস্ত্মাবটা একটু ভিন্ন।

আমাদের শিক্ষার্থীরা কিন্তু গেস্নাবাল বিষয়-বৈশ্বিকতার সঙ্গে দারম্নণভাবে সংযুক্ত। তাদের হাতে স্মার্টফোন। অনলাইন দুনিয়ায় সংযুক্ত এই প্রজন্মটি সার্বক্ষণিকভাবেই পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে তার খবর পেয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা বিষয়ে যেকোনো ট্রপিক তারা অনলাইন থেকে সংরক্ষণ করে নিচ্ছে। কিন্তু ঘাটতি যেটাতে সেটা হলো একজন যোগ্য শিক্ষকের কাছ থেকে বিষয়গুলো বুঝে নেয়া। এই স্থানটিতেই পিছিয়ে পড়ছে আমাদের ছেলে মেয়েরা।
আমরা আমাদের ক্লাসরম্নমগুলোকে ভার্চুয়ালি উন্নত বিশ্বের ক্লাসরম্নমের সঙ্গে সংযুক্ত করে ফেলতে পারি। আমরা অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, হাভার্ড, স্ট্যানফোর্ড প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাসরম্নমের সঙ্গে আমাদের ক্লাসরম্নম অনলাইনের মাধ্যমে সংযুক্ত করলে সেখানকার ক্লাসগুলোতে সরাসরি আমাদের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে। অথবা ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অভিজ্ঞ প্রফেসরদের রেকর্ডকৃত লেকচার সংগ্রহ করতে পারি। বিশ্বের সব প্রতিষ্ঠান থেকেই এ উপায়ে লেকচার সংগ্রহ সম্ভব। একজন ভালো প্রফেসরের রেকর্ডকৃত লেকচার আমাদের তরম্নণ শিক্ষকরা ক্লাসে উপস্থাপন করতে পারেন বড় টিভি মনিটর বা প্রজেক্টরের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের কাছে যেটা বোধগম্য হবে না তার ব্যাখ্যা দিবেন ক্লাস পরিচালনাকারী এই শিক্ষক। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন সবচেয়ে উপযোগী ক্লাসটি পাবে, তেমনি তরম্নণ শিক্ষকটিও কিন্তু নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ পাবেন। এভাবে টেকনোলজি ব্যবহার করে আমরা উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের যে প্রশ্ন আছে, সেটা পূরণ করতে পারি। ডিজিটাল মেশিন ব্যবহার করে টিচারদের কোয়ালিটি বাড়ানো যাবে এভাবে। তাদের বুদ্ধি ও মেধার সম্প্রসারণ ও দক্ষতা বাড়বে এ পন্থায়। তাদের গুণগত মান আরো ধারালো শক্তিমান হবে। প্রযুক্তিগত শিক্ষাউপকরণ দিয়ে কিভাবে কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় তা ভেবে দেখতে হবে।

শিক্ষক স্বল্পতা পূরণে বিকল্প আরও একটি প্রস্ত্মাব উপস্থাপন করা যায়। আমরা বর্তমান পৃথিবীকে ওয়ার্ক-অরিয়েন্টেড ওয়ার্ল্ড বলছি। শুধু ক্লাসরম্নমের জ্ঞান অর্জনকে এখন আর গুরম্নত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে না। ক্লাসরম্নম আর শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগশাজস বৃদ্ধির উপর গুরম্নত্ব দেয়া হচ্ছে। শিল্পক্ষেত্র প্রতিনিয়ত তাদের উপায় উপকরণে পরিবর্তন আনছে। কাজেই শিল্পজ্ঞানেও পরিবর্তন আসছে সঙ্গত কারণে। এখানে একজন শিক্ষক তাই পিছিয়ে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের কাছে সঠিক জ্ঞান পৌঁছাতে গেলে তাদের সামনে আনতে হবে শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষদের। এভাবে শিল্প বিশেষজ্ঞরা হয়ে উঠতে পারেন আদর্শ শিক্ষক। অভিজ্ঞদের কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাস্ত্মব জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ করে গড়ে তুলতে পারবে। তাদের জ্ঞান হবে বাস্ত্মব ও কর্মমুখী। একইভাবে ক্লাসে যা শেখা হচ্ছে, ক্লাস থেকে বের হয়েই তার প্রায়োগিকতা দেখাতে হবে। সাধারণ শিক্ষক বা শতভাগ অব্যবহারিক একাডেমিশিয়ানদের হাতে ক্লাস না রেখে ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের অংশগ্রহণ জরম্নরি।

সমস্যা যেহেতু আছে, সমস্যার উত্তরণও নিশ্চই থাকবে। আমাদের আরও ভাবতে হবে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি নিয়ে। সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও যথাযথভাবে কীভাবে করা যায় তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। তবে এসব কিছুতে সরকারি সহযোগিতা একান্ত্মভাবেই প্রয়োজন হবে। সরকারি ও বেসরকারি অংশগ্রহণে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের দেশাত্মবোধ জাগ্রত ও দেশ গঠনে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলব, এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।

লেখক : প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুলস্নাহ: প্রফেসর, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উপাচার্য, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি খুলনা। চেয়ারম্যান, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ট্রাস্ট।

 

সূত্র : jaijaidinbd.com

error: Content is protected !!